দেশের সিরামিক খাত চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এ মাসে বাংলাদেশ থেকে রফতানি হয়েছে ৩ দশমিক ১৫ মিলিয়ন ডলারের সিরামিক পণ্য, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ দশমিক ৭২ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সংকট কিছুটা কমে আসায় উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে। তবে সংকট পুরোপুরি কাটেনি। গ্যাস সরবরাহ সন্তোষজনক অবস্থায় এলে এ খাত অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে (জুলাই-জুন) বাংলাদেশ থেকে ৩৩ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন ডলারের সিরামিক পণ্য রফতানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের (২০২৩-২৪) ৩৩ দশমিক শূন্য ৯ মিলিয়ন ডলার থেকে ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেশি। তবে চলতি বছরের জুনে রফতানি হয়েছে ২ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২ দশমিক ৯২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ রফতানি কমেছে ১২ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজার তো বটেই, দেশের বাজারেও এ খাতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়।
বাংলাদেশের সিরামিক খাত ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে টেবিলওয়্যার, টাইলস ও স্যানিটারিওয়্যার রফতানি করে থাকে। দেশের বাজারেও সিরামিক পণ্যের বিপুল চাহিদা রয়েছে, যেখানে টাইলসের ৮৫ শতাংশ, স্যানিটারিওয়্যারের ৫৯ শতাংশ ও টেবিলওয়্যারের ৯২ শতাংশ স্থানীয় কারখানায় উৎপাদন করা হয়। বর্তমানে এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের। এছাড়া সরকার প্রতি বছর এ খাত থেকে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পাচ্ছে। অন্যদিকে গ্যাস বিল বাবদ উৎপাদকরা পরিশোধ করছেন প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সংকট সিরামিক খাতের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পণ্য উৎপাদনে নিরবচ্ছিন্ন ও গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ অপরিহার্য। অথচ অনেক কারখানায় বর্তমানে গ্যাসের চাপ মাত্র ২-৫ পিএসআই, যা প্রয়োজনীয় ১৫ পিএসআইয়ের তুলনায় অনেক কম। কোথাও কোথাও গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ২০ কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করছেন উৎপাদকরা। গ্যাস সংকটের কারণে বর্তমানে অনেক কারখানা সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক উৎপাদন করছে। চুল্লি একবার বন্ধ হয়ে গেলে তা পুনরায় চালু করতে তিনদিন সময় লাগে, এতে ব্যয় বেড়ে যায় ও পণ্যের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সিরামিক শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক অর্ডার বাতিলের ঝুঁকি বাড়বে, যা শুধু রফতানি আয় নয়, দেশের ভাবমূর্তির জন্যও নেতিবাচক। তাদের মতে, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। বিদেশী ক্রেতারা সময়মতো পণ্য না পেলে অন্য উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাজার হারানোর ঝুঁকি তৈরি করে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য উদ্যোক্তারা গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক ও দাম স্থিতিশীল রাখা এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলছেন, কো-জেনারেশন, হিট রিকভারি সিস্টেম ও এনার্জি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে এ খাতে গ্যাস ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সিরামিক খাত করোনা মহামারীর পর থেকে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সিরামিক পণ্যের রফতানি আয় ছিল ৬৮ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন ডলার। করোনা-পরবর্তী সময়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৩৩ দশমিক শূন্য ৯ মিলিয়ন ডলারে। সম্প্রতি কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও এখনো মহামারীর আগের অবস্থানে ফেরেনি।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, গ্যাস সংকট, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ডলারের সংকট ও মূল্যস্ফীতি মিলিয়ে এ খাতের অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছে। রফতানিমুখী অনেক কারখানা বিদেশী ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করতে না পারায় অর্ডার হারাচ্ছে।
দেশীয় বাজারে চাহিদা থাকলেও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের কারণে সিরামিক পণ্যের দাম বাড়ছে। এতে ক্রেতারা বিকল্প হিসেবে আমদানীকৃত বা নিম্নমানের পণ্যের দিকে ঝুঁকতে পারে, যা দেশীয় শিল্পের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অনেক সিরামিক কোম্পানির বিক্রি ও মুনাফা কমেছে। যদিও কিছু শেয়ারের রিটার্ন ভালো থাকলেও সামগ্রিকভাবে খাতটি চাপের মুখে রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশী প্রতিযোগীরা প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে এগিয়ে থাকায় তাদের তুলনায় বাংলাদেশে সিরামিক পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেশি, যা মূল্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে।